আমাদের ত্বকে যে সমস্ত কোষ আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো
মেলানোসাইট (melanocyte)।
এই কোষ মেলানিন নামক রঞ্জক পদার্থ তৈরি করে আমাদের ত্বকের স্বাভাবিক বর্ন প্রদান করে। এই মেলানোসাইট আমাদের ত্বকের সর্বত্র সুষম ভাবে বণ্টিত (uniformly distributed)। কিন্তু কোনো কারণে যদি অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজনের ফলে ত্বকের কোনো অংশে একত্রিত ভাবে একগুচ্ছ মেলানোসাইটের জন্ম ও বৃদ্ধি হয় (grow in cluster) তাহলেই তিল বা আঁচিলের সৃষ্টি হয়ে থাকে।
সাধারণত এই তিল বা আঁচিল ক্ষতিকারক তো হয়ই না, বরং খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। জীবনের প্রথম ২৫ বছরের মধ্যে ১০-৪০টি তিল প্রায় সকলের শরীরেই থাকে। আবার অনেক সময় এই তিল বা আঁচিল সময়ের সাথে সাথে বিলীন হয়ে যায়, আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার বর্ণ, আকার এবং উপস্থিতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে।
এইবার চলুন একটু দেখে নেওয়া যাক এই তিল বা আঁচিল কত প্রকার হয়;
জন্মদাগ বা কনজেনিটাল নেভি: জন্মের সময় থেকে উপস্থিত কনজেনিটাল নেভি প্রায় 100 জনের মধ্যে একজনের মধ্যেই দেখা যায়। তবে এই ক্ষেত্রে মেলানোমা (ক্যান্সার) হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বেশি থাকে।

ডিসপ্লপ্লাস্টিক নেভি: এটি আকারে কনজেনিটাল নেভির থেকে আকারে সামান্য বড় এবং আকারে অনিয়মিত হয়। গাঢ় বাদামী বর্ণের কেন্দ্র এবং হালকা, অসম প্রান্ত। এই নেভিগুলি মেলানোমা হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বেশি। আসলে, যাদের ১০ বা ততোধিক ডিসপ্লপ্লাস্টিক নেভি রয়েছে তাদের ত্বকের ক্যান্সার, মেলানোমা হওয়ার ১২ গুণ বেশি সম্ভাবনা রয়েছে।
আঁচিল বা স্কিন ট্যাগ: এগুলি সাধারণত বিপদ্দজনক নয় এবং কোনো ব্যথাও সৃষ্টি করে না। আঁচিল ঘাড়ে, বুকে, পিঠে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। মহিলাদের ওজন বৃদ্ধির সাথে সাথে এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে আঁচিল হওয়ার বেশি প্রবণতা দেখা যায়।
লেন্টিগো (lentigo): শ্বেতাঙ্গ মানুষের মধ্যে লেন্টিগো হওয়ার বেশি প্রবণতা দেখা যায়। সাধারণত এ ক্ষেত্রে ত্বকের কোনো অংশ বাকি অংশের তুলনায় গাঢ় হয়ে থাকে। অতিরিক্ত সূর্যালোক, জেনেটিক্যাল কারণ অথবা রেডিয়েশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসাবে লেন্টিগোর আবির্ভাব হতে পারে।
ফ্রেকল (Freckles): সাধারণত যারা ফর্সা হয় তাদের মধ্যে এই ফ্রেকল দেখা যায়। মুখ, বাহু, ঘাড় এবং বুকে এই বাদামি রঙের ছোট ছোট স্পট সৃষ্টি হয়। এটি একেবারেই বিপদ্দজনক তো নয়ই বরং খুব স্বভাবিক।
সেবোরহেইক কেরাটোসিস (Seborrheic Keratoses): এটি কেরাটোসাইট নামক কোষ থেকে সৃষ্টি হয় I কালো অথবা খয়েরি বর্ণ বিশিষ্ট ত্বকের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বুক, পিঠ এবং কিছু ক্ষেত্রে মাথায় দেখা যায় তবে এটিও ক্যান্সার বা অন্য কোনো ক্ষতি সাধন করে না।

এ তো গেলো তিলের ইতিবৃত্ত, কিন্তু ঠিক কোন কোন ক্ষেত্রে আপনার তিল আপনার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে? এক্ষেত্রে, নিচের ABCDE কে আমরা একটা থাম্ব রুল ভাবতে পারি।
১. অপ্রতিসাম্য (Assymetry), এ ক্ষেত্রে তিলের এক প্রান্তের সাথে আরেক অংশের সমতা থাকে না।
২. প্রান্তীয় অংশ (Border), তিলের সীমান্ত বা প্রান্তগুলো ঝাপসা বা irregular হয়ে থাকে।
৩. বর্ণ (Colour), তিলের বর্ণ সব জায়গায় সমান না হয়ে কিছু অংশে ট্যান, বাদামি, কালো, নীল, সাদা বা লাল রঙের শ্যাডো পরিলক্ষিত হয়।
৪. ব্যাস (Diameter), একটি তিল আকারে পেন্সিল ইরেজার চেয়ে বড় হয়।
৫. বিবর্তন (Evolution), তিলের আকার, আকৃতি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে।
পরিশেষে, একটাই কথা বলবো যে তিল বা আঁচিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিকারক নয়, তবুও যদি আপনার মনে কখনো সংশয় সৃষ্টি হয় অথবা উপরে উল্লেখ্যিত কোনো লক্ষণ প্রকাশিত হয় অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করুন।
0 Comments